
তসলিমা নাসরিন:
বিয়ের চলটা শুরু হয়েছিল পিতৃত্বের নিশ্চয়তার জন্য। যা চাওয়া হত, তা এরকম। পুরুষস্পর্শহীন একটি কুমারী শরীর চাই। বিয়ের পর তুমি আমার সঙ্গে ছাড়া আর কারও সঙ্গে শোবে না, তোমাকে আমি ছাড়া আর কেউ স্পর্শ করতে পারবে না। আমি, শুধু আমি, আমি তোমাকে গর্ভবতী করবো, তোমার গর্ভে আমার সন্তান বড় হবে, তুমি প্রসব করবে আমার সন্তান। আমার পুত্র সন্তান। আমার পুত্র আমার বংশ রক্ষা করবে, আমার সম্পত্তির উত্তরাধিকারী হবে। পুরুষতান্ত্রিক ব্যবস্থা টিকিয়ে রাখার জন্য পুরুষকে সাহায্য করে মেয়েরা, বিয়ে করে। এই সাহায্যটা না করলে পুরুষতন্ত্র কবেই কবরে চলে যেত।
মেয়েদের শরীর আর কোনও পুরুষের সংস্পর্শে যেন না আসে, সে ব্যাপারটি নিশ্চিত করার জন্য যে প্রক্রিয়ায় তাদের ব্যক্তিগত সম্পত্তি করা হয় এবং ঘরবন্দী করা হয়, সে প্রক্রিয়ার নাম বিয়ে। বিয়েটা হল যৌন সম্পর্ক করার পারিবারিক আর সামাজিক লাইসেন্স।
বাঙালি সমাজে দেখেছি, বিয়ের পর পুরুষের নয়, মেয়েদের ডানাটাই কাটা পড়ে। বেশির ভাগ মেয়েকে এখনও শ্বশুরবাড়িতে তোলা হয়। নিজের নামের শেষে স্বামীর পদবি জুড়তে হয়। নিজের ঘরদোর আত্মীয়স্বজন বন্ধুবান্ধব পরিবেশ প্রতিবেশ শহর বন্দর সব ছাড়তে হয় মেয়েকে। মেয়ে প্রাপ্ত বয়স্ক হলেও, শিক্ষিত হলেও, সে কোথায় যাবে বা না যাবে, কাদের সঙ্গে মিশবে বা না মিশবে, চাকরি করবে কি চাকরি করবে না সেই সিদ্ধান্ত স্বামী এবং স্বামীর আত্মীয়স্বজন নেয়। একসময় তো প্রচলিত ছিলই, এখনও অনেকে বলে যে, ‘বিয়ের পর চাকরি করা চলবে না’। সতী সাবিত্রি থাকার জন্য ঘরে থাকাটা ভালো। ঘরের কাজ করবে, শ্বশুর শাশুড়ি দেবর ভাসুর স্বামীর সেবা করবে, সন্তান বড় করবে।
যুগ পাল্টেছে। মেয়েদের আজকাল আক্ষরিক অর্থে ঘরবন্দী করা হয় না। তবে পায়ে অদৃশ্য একটা শেকল থাকে। আজকাল চাকরি বাকরি করতে বাইরেও যেতে দেওয়া হয়। তবে সংসারের খাতেই খরচ করার নাম করে তার উপার্জনের টাকাটা নিয়ে নেওয়া হয়! তোমার জুতোটা মুছে দেওয়া, তোমার ভাতটা বেড়ে দেওয়া, তোমার কাপড়গুলো কেচে রাখা- হেঁদি পেঁচি ক-অক্ষর-গোমাংসও এ কাজগুলো করতে পারে। কিন্তু শিক্ষিত, সুন্দরী, শয্যাসঙ্গীটি করলে মনে পুলক লাগে। সব ঠিকঠাক মতো না হলে কাজের মেয়ে মুখ ঝামটা দিয়ে চলে যায়। আর বিনা বেতনের চাকরানি হল স্ত্রী, যা ইচ্ছে তাই করো, এই চাকরি সে ছাড়বে না। স্ত্রীর চাকরি। হাড়ভাঙা খাটুনি। বেতন নেই। ছুটি ছাটা নেই। পেনশন নেই। যৌতুকের টাকাও দেবে, ক্রীতদাসীও হবে। লোকে টাকা দিয়ে কেনে। মেয়েরা টাকা দিয়ে নিজেকে বিক্রি করে।
পণপ্রথা নিয়েই না হয় বলি আজ। পণপ্রথা আজকের নয়। প্রথাটি কয়েক হাজার বছরের পুরোনো। পৃথিবীর বহু দেশেই এই প্রথা ছিল, অনেক দেশে এখনও আছে। অবৈধভাবে হলেও আছে। গোটা উপমহাদেশেই এই প্রথা চলছে। আইন করেও, শাস্তি দিয়েও এই প্রথা বন্ধ করা যাচ্ছে না। এই পণের কারণে হাজারো বধূকে হত্যা করা হচ্ছে, হাজারো বধূ অসম্মানিত আর অপমানিত হয়ে আত্দহত্যা করছে। যতদূর জানি প্রাচীনকাল থেকেই এই অঞ্চলে পণপ্রথার চর্চা চলছে। কিন্তু পুরোনোকালের কিছু পর্যটক তাঁদের বইয়ে লিখে গেছেন, ভারতবর্ষে বিয়েতে তাঁরা কাউকে পণ দিতে দেখেননি। জানি না, তখন হয়তো পণপ্রথা এখনকার মতো এত ভয়ংকর ছিল না, অথবা পর্যটকের চোখে পড়েনি পণের আদান প্রদান। প্রাচীন গ্রিসের রাজা আলেক্সান্ডার দ্য গ্রেট ভারতের বিয়েতে পণ দিতে দেখেননি। পারস্য দেশের বুদ্ধিজীবী আল বিরুনি ভারতবর্ষে ১০১৭ সালে এসেছিলেন, ছিলেন ষোলো বছর। তাঁর আত্দজীবনীতেও আছে ভারতের বিয়ের বর্ণনা, যেখানে পণের কোনও চিহ্ন নেই।
প্রাচীনকালের যৌতুক একতরফা ছিল না। বধূর তরফ থেকে বরকে দেওয়া হতো, বরের তরফ থেকেও বধূকে দেওয়া হতো। বরের তরফ থেকে বধূর পরিবারে পণ দেওয়ার কারণ ছিল, ওই পরিবারে একজন শ্রমিক কম পড়ে যাওয়ার ক্ষতিপূরণ। আর বধূর পরিবার থেকে বরের পরিবারে যে পণ দেওয়া হতো, সেটি মূলত পিতার সম্পত্তি থেকে উত্তরাধিকার সূত্রে বধূটির যা পাওয়ার কথা ছিল, তা। তখনকার আইন কন্যাদের উত্তরাধিকার থেকে বঞ্চিত করতো।
এখন এই আধুনিককালের উত্তরাধিকার আইন কন্যাদের বঞ্চিত করে না। পুত্রদের মতোই কন্যারাও বাবা-মায়ের সম্পত্তির ভাগ পায়। উপমহাদেশের প্রতিটি দেশেই আজ পণ বা যৌতুক নিষিদ্ধ। কিন্তু এই নিষেধাজ্ঞা পণের চর্চাকে ঠেকাতে পারছে না। মেয়েরা যত নিচে নামে, পণ তত ওপরে ওঠে। আসলে বলা উচিত, সমাজে মেয়েদের অবস্থানকে যত নিচে নামানো হয়, পণের টাকাকে তত বাড়ানো হয়। এই নামানো বাড়ানোর দড়িটা থাকে পুরুষতন্ত্রের হাতে।
ভারতে পণের কারণে বধূনির্যাতন আর বধূহত্যা ভয়াবহ আকার ধারণ করেছে। বাংলাদেশেও তাই। বেশির ভাগ বধূহত্যাকে বধূর আত্দহত্যা বলে চালিয়ে দেওয়া হয়। বেশির ভাগ বধূনির্যাতনকে পরকীয়া সম্পর্কের কারণে বর বধূর মধ্যে ঝগড়া লড়াই হচ্ছে বলে প্রচার করা হয়।
বাঙালি মুসলমানের বিয়েতে বরের পক্ষ থেকে বধূকে দেনমোহর দেওয়ার যে নিয়ম, সেটি আদৌ দেওয়া হয় কি না আমার সন্দেহ। তবে বধূর পরিবার থেকে বরকে বা বরের পরিবারকে পণের টাকা, আসবাবপত্র, বাড়ি গাড়ি, ইত্যাদি দিতেই হবে। না দিলে বা দিতে দেরি হলে বধূর ওপর চলে অকথ্য নির্যাতন। স্বামী স্ত্রীর সম্পর্ক হওয়া উচিত ভালোবাসার, বিশ্বাসের। কিন্তু যৌতুক এই সম্পর্ককে নষ্ট করে দিয়েছে। এখন সম্পর্কটা পুরুষের জন্য টাকা পয়সার, স্বার্থপরতার, আর নারীর জন্য বিসর্জনের, বেগার খাটার। ভারতে বধূকে পুড়িয়ে মারা হয়, বাংলাদেশে পুড়িয়ে মারার চল খুব একটা নেই, মারা হয় কুপিয়ে, নয়তো বিষ খাইয়ে।
যৌতুকের লোভ যে লোকের, সেই নিকৃষ্ট, স্বার্থপর, ক্ষুদ্র লোককে বিয়ে করা বন্ধ করুক মেয়েরা। ওদের সঙ্গে সংসার করার চেয়ে একা থাকা অনেক ভালো। কেউ কেউ মনে করে যৌতুক বেশি দিলে স্বামীর নির্যাতন কমে। এ ভুল প্রমাণিত হয়েছে।
যত বেশি যৌতুক দেবে, লোভী লোকের লোভ তত বাড়বে, লোভ বাড়লে অত্যাচার বাড়ে। যৌতুকের লোভ সব শ্রেণীর পুরুষদের। কপর্দকহীন থেকে কোটিপতির। মেয়েদের এখনও সহযাত্রী, সহকর্মী, সমানাধিকারী, ভাবছে না পুরুষেরা। এখনও ভাবছে মেয়েরা ঠিক মানুষ নয়, মানুষ হলেও কিছুটা ‘কম মানুষ’। এই দুষ্টচিন্তাটা যতদিন না দূর হবে, ততদিন এই পৃথিবীতে ভুগতে হবে মেয়েদের। মানুষ ছাড়া অন্য কোনও প্রজাতির মধ্যে নারী পুরুষে এরকম বৈষম্য নেই। মানুষ জাতটার লজ্জা হবে কবে?
লেখক : নির্বাসিত লেখিকা।
পাঠকের মতামত